‘ অপ্সরী ‘

এসএসসি দিয়ে কলেজে উঠার পরপরই নিজের মধ্যে কেমন একটা এডাল্ট এডাল্ট ভাব চলে আসে। স্বাভাবিকভাবেই এই সময়টাতে আমরা নিজেদের বড় ভাবতে শুরু করি। নিজের মধ্যে “সব বিষয়ে আমার পারদর্শিতা আছে”——এমন একটা ভাব চলে আসে।
স্কুলে থাকতে প্রেম ভালোবাসা কি জিনিশ বুঝতাম না। তবে কলেজে উঠার পর থেকে যেন মনে হচ্ছে,এই বিষয়ে আমার থেকে অভিজ্ঞ আর কেউ হতে পারেনা!
কলেজে ভর্তি নিয়ে অনেক বেশি উত্তেজিত ছিলাম আমি!নতুন জায়গা নতুন কিছু মানুষের সাথে পরিচয় – অদ্ভুত এক আনন্দ কাজ করছিলো। কলেজে ভর্তি যে মাসে হলাম ঠিক তার পরের মাসে ক্লাস শুরু হলো।
অরিয়েন্টেশনের দিন কলেজে গেলাম। সবাই বেশ ট্রেন্ডি লুক দিয়ে এসেছে! ফার্স্ট ইম্প্রেশন ইজ দ্য বেস্ট ইম্প্রেশন –বলে একটা কথা আছে!
পুরো কলেজে সবাই এদিক ওদিক ঘুরে কলেজটাকে দেখছে,আমিও দেখছিলাম। তবে এত কিছুর মাঝে আমার ওই একটা মেয়ের দিকেই চোখ আটকে যায়,বিশ্বাস করবেন আপনি?তাকে ঠিক মেয়ে বললে ভুল হবে,বলা যায় যেন এক অপ্সরী নেমে এসেছে! সম্ভবত হাজারো নারীর স্রোতে সে থাকলেও আমার চোখ প্রথমে তার দিকেই যেতো! প্রজাপতির মত ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো এক অপ্সরী,ধরতে গেলেই যেন হাত থেকে ফসকে যাবে আর আমার হাতে রেখে যাবে তার ডানার ঝলমলে রং!
অরিয়েন্টেশন শেষে সবাই কলেজ থেকে বের হচ্ছে,আমি অডিটোরিয়াম এ ছিলাম, বেশ বড় আর সুন্দর অডিটোরিয়াম টা। বের হওয়ার সময় দেখি সেই অপ্সরী, এক কোণায় চুপচাপ বসে আছে। ভাবছিলাম কাছে গিয়ে বসে কিছুক্ষণ কথা বলি!
কিন্তু না সাহস হলো না (!) এদিক থেকে আমি আবার বড্ড ভীতু কিনা!
যাইহোক,সেদিন বাসায় চলে আসি আমি।আমার রাতের ঘুম? সে তো কেড়েই নিয়েছে সেই অপ্সরী!
পরেরদিন কলেজে গিয়েও দেখলাম তাকে।সবচেয়ে খুশি হয়েছিলাম এই দেখে যে সে আমারই সেকশনে!তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো তাকে কখনো কারো সাথে কথা বলতে দেখিনি,না সে যে কথা বলতে পারেনা এমন টা নয় সেটা তো সেদিনই বুঝেছিলাম,গান গাইছিলো,বড্ড মিষ্টি গলা,যেন বসন্তের কোকিল সুর ধরেছে!
খুব অদ্ভুত লেগেছে যে,মেয়েটা একাই আসে কলেজে,চুপচাপ ক্লাসে আসে আর ক্লাস শেষে বেড়িয়ে যায়,এমনকি রোল প্রেজেন্ট ছাড়া স্যার ম্যাডামের সাথে ও কথা বলে না!
এভাবে তাকে দেখতে দেখতেই আমার বেশ কয়েকদিন কেটে যায়,এদিকে কলেজে আমার বেশ কিছু নতুন বন্ধু বান্ধব ও জুটে যায়।
একদিন কলেজ ছুটির পর কলেজের ওয়েটিং রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছি,ছাউনির মত একটা জায়গা। বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি,এই বৃষ্টিতে ছাতা নিয়ে বের হওয়াও দূঃসাধ্য।হঠাৎ দেখি ওই মেয়েটা আমার পাশে এসে দাঁড়ায়।তার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।কি আশ্চর্য! মেয়েটা কাঁদছে কেন!
আমি কিছু না ভেবে জিজ্ঞেস করে ফেললাম,
– তুমি কাঁদছো কেন? কি হয়েছে!কোনো সমস্যা?
– আপনি দয়া করে আমাকে সাহায্য করবেন?
– হ্যা নিশ্চয়ই! বলো কি সাহায্য?
– আমি নিপা, আজিমপুর এ হোস্টেলে থাকি, কলেজে একাই আসা যাওয়া করি।অরিয়েন্টেশন এর দিন কলেজ থেকে বাসায় যাওয়ার পর দেখি আমার রুমের সামনে তালা ঝুলছে!কিন্তু তালা থাকার কথা ছিলো না!আমার রুমমেট সেদিন অসুস্থ বলে কাজে যায়নি! তো আমই হোস্টেল সুপারের কাছে চাবির জন্য যাবো বলে রওনা দিব, ঠিক এমন সময় কেউ একজন আমার মুখ চেপে ধরে!তারপর………”
ওই যে আমার বাস এসে গেছে,কিছু মনে করবেন না আপনাকে বিরক্ত করলাম,সময় করে আরেকদিন বলবো নে! শুনবেন কিন্তু!
– জ্বি অবশ্যই!সাবধানে যাবেন আপনি।
মেয়েটার ওই অসমাপ্ত কথা ভাবতে ভাবতে আমি বাসায় চলে আসি,নানান কিছু ভাবছিলাম। তারপর হয়তো এটা হয়েছে,নাহলে ওটা হয়েছে—- এসব ভাবতে ভাবতে সেদিন পার হয়।আমি পরদিন কলেজে এসেই মেয়েটাকে খোজা শুরু করি।কিন্তু না সে আসেনি সেদিন।
পরদিনও সে আসে না। এভাবে কয়েকদিন পার হয়ে যায়।অবশেষে আমি না পেরে বন্ধুবান্ধব দের মাঝে খোঁজ নেয়া শুরু করি!
বড় অবাক করা ব্যাপার এই যে তারা প্রত্যেকে বলে এরকম কোনো মেয়েই নাকি আমাদের কলেজে বা ক্লাসে ছিলো না!
আমি অবশেষে স্যারের খাতা চেক করতে বাধ্য করি,হাজার অনুনয় বিনয় করে দপ্তরি চাচাকে দিয়ে অফিসে স্টুডেন্টদের সমস্য হিস্টোরি চেক করাই!
কিন্তু আশ্চর্য যে নিপা নামে বা ওই মেয়ের ছবি দেয়া কোনো শিক্ষার্থীই ছিলো না! বা কলেজ থেকে টিসি নেয়া ও ছিলো না! এমন কি স্যারের এটেন্ডেস খাতা চেক করাই,সেখানেও বাড়তি কেউ ছিলো না!
-তাহলে কি অপ্সরী আমায় মিথ্যে বললো??

আমি নাহয় মিথ্যেটাকেই ভালোবেসেছিলাম

– লিখেছেন: Tabassum Sruty

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s