‘ চন্দ্রকথা ‘

সে সময় বৈশাখ মাস চলতেছিলো,কয়েকজন বন্ধু মিলে ঠিক করা হলো বৈশাখের মাঝামাঝিতে একটা জায়গাতে যাবো।।। ঠিক করা সময় মতো সবাই রওনা দিলাম সারিয়াকান্দি ঘাটে বৈশাখের ভোর বড়ই অদ্ভুত আকাশ টা থ মেরে চেয়েছিলো প্রচুর বাতাস বইতেছিলো আর যমুনাতে গড়ান উঠে যেন এক নব যৌবনা রমনীর মতো তেজস্বী দেখাচ্ছিলো।।
আমি পাঞ্জাবী পরে তার উপরে পাতলা একটা চাদর মুড়িয়ে দাড়িয়েছিলাম যমুনার ঘাটে, একবন্ধু গিয়ে নৌকা ঠিক করলো আমাদের সাথে সাতজন মেয়ে ছিলো তার মধ্যে পাঁচজন আমাদের ব্যাচের বাকী দুজন মেহমান মানে আমার দুই বান্ধবীর ছোট বোন ছিলো ওরা আপন নয় তবে কেমন সেটা জানি না।।।
সবাই নৌকায় গিয়ে চড়লাম প্রায় সবাই জড়সড় হয়ে নৌকার ছইয়ের মাঝে বসে ছিলো আমি শুধু নৌকার আগায় গিয়ে বসলাম।।।প্রবল বেগে ছুটে আসা বাতাসে সারা শরীর শিহরিত হয়ে উঠতেছিলো উষ্ক শুষ্ক লম্বা চুল গুলো বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে খেলতেছিলো।।। হাতের মাঝে একটু সোনালী পাতা ডলতেছিলাম তখন রিনু আমার কাছে এসে বসলো আমি বিনয়ের হাসি দিলাম তারপর নিজের কাজে মনোনিবেশ করলাম। রিনু জানতে চাইলো তুই কি জীবনে ভালো হবি না রে কেন এমন করিস বলতো?!!
আমি আবার হাসলাম, রিনুর সাথে ওর খালাত বোন এসেছিলো যাকে আমি চন্দ্রকথা বলে ডাকতাম আগেও এই পিচ্চি মেয়েটাকে দেখেছি আমি।। চন্দ্রকথাকে দেখলাম সে আমার আর রিনুর দিকে তাকিয়ে আছে আমার আবার একটা সমস্যা আছে আমি অতিরিক্ত সেবন করার পর ভাবের জগতে থাকি তখন সব মেয়েকেই আমার অনেক বেশি সুন্দর মনে হয়, মনে হয় দেবী বসে আছে গিয়ে ধুপ কলকি দিয়ে পূজা করি।।।
আমার মৌনতা দেখে রিনু বললো আচ্ছা বন্ধু তুই কি আবার সব কিছু নতুন করে শুরু করতে পারিস না? আর কতকাল এভাবে কাটাবি?? শোন না রুদ্র তোকে তোর চন্দ্রকথা খুবই পছন্দ করে, তুই একটা বার চেয়ে দেখ ওই মেয়েটার নিষ্পাপ চেহারার দিকে ও কি তোর আলোকলতার থেকে কোন অংশে কম সুন্দর বল??আমি জানি ওই মেয়েটা রুপে গুনে অতুলনীয় তবে আমি কি করবো কুকুরের পেটে ঘি হজম হয় না যে।।।
রিনু একটু রেগে গিয়ে বললো তোর বালের আলোক ফালোককে আমি দেখেছি ও কিন্তু চন্দ্রকথার মতো অতো সুন্দর না।। একটু দেখ না ভাই আমার! মেয়েটা যে তোকে ভালোবেসে ফেলেছে।।।
আমি হাসলাম আর বললাম আরে পোড়ামুখী তুই কি আমার চোখ দিয়ে কখনো আলোককে দেখেছিস যদি পাড়িস একটা বার দেখে দেখিস মেয়ে হয়েও আলোকলতার প্রেমে পরে যাবি বুঝলি!!
আর আমি চন্দ্রকথার মাঝে সৌন্দর্যকে দেখি প্রতিনিয়ত দেখি তবে তুই যে অন্ধকে দুনিয়া দেখানোর বৃথা চেষ্টা করতেছিস এটা কি আদৌ সম্ভব অন্ধ তো তার দুনিয়া তার ভাবের মতো তৈরী করে নেয়।।।
আমার হাতের কাজ শেষ লাইটার বের করে কষে কষে কয়েকটা টান মেরে বাকীটুকু এক বন্ধুর হাতে দিলাম বন্ধুটার নাম বললে মাংসম্মাং থাকবে না তার।।।
নৌকার ভিতর গিয়ে বসলাম, চন্দ্রকথা দেখি একটু নড়ে আমার কাছ ঘেষে বসলো আমার একটু কেমন জানি লাগলো তবে কিছু বললাম না,
নদীতে গড়ান উঠেছে আর বাতাসের তিব্রতা আরো বেড়েছে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, মাঝি নৌকাটা একটা চরের কাছে নিয়ে ঠেকিয়ে দিয়ে আমাদের জানালো ঝড় কমলে নৌকা ছাড়বে ততক্ষন এখানেই থাকা লাগবে।।
একটা বন্ধু ছিলো যে দোতরা নিয়ে টুংটাং করা শুরু করছে তারে আমরা বয়াতী বইলা ডাকি।। দোতরা যন্ত্রটা আমার খুব প্রিয় যদিও বাজাইতে পারি না।।। দোতরার সুরে সুরে শরীর নড়া শুরু করেছিলো কখন জানি গলা ছেড়ে গান গাওয়া শুরু করেছি নিজেই জানি না।।।
সে কি আমার হবার কথা আপন বেগে
আপনি মরি,
ও মোর গৌড় এসে হৃদে বসে
করলো আমার মনো চুরি।।

‎ঝড় কমাতে আমরা গন্তব্যে পৌছে গেলাম গৌধুলীর সময়।।। সবাই হাটা শুরু করলাম মেলার উদ্দেশ্যে
‎চন্দ্রকথা দেখি আমার পাশ দিয়ে হাটতেছে আমরা সবার পেছনে আমার হাতে মাটির বাশি আগুন জ্বলতেছে ধোয়া উড়তেছে।।।
‎সে আমাকে বললো আচ্ছা ঠাঁকুর তোমার কি মন বলতে কিছুই নাই!! তুমি কি মনের ব্যাথা বুঝো না!! তুমি কি চোখের ভাষা বুঝো না!!
‎আমি তো ভাবতাম তুমি সরল, কোমল তবে বুঝি নাই সরলতা কোমলতার পিছনে লুকিয়ে রয়েছে এক জেদি কঠোর পাষাণ হৃদয় যে নিজের ক্ষতি করতেও দ্বীধাবোধ করে না।।।
‎আমি রক্তজমাট বাধা চোখ তুলে চেয়ে দেখি তার চোখে পানি।। আমি কিছুই বললাম না শুধু ভাবলাম হায়রে নির্বোধ মরলি তো শেষে অগ্নিকুন্ডেই ঝাপিয়ে এই অগ্নিকুন্ডের যে শুরু আর অন্ত কোনটাই নাই।।
‎চন্দ্র আবার বললো আচ্ছা ঠাঁকুর কেন নিজের এতো ক্ষতি করো বলবে আমায়!!আচ্ছা তোমার কি নারী দেহের প্রতি লোভ জাগে না!! তুমি কি মায়ায় বদ্ধ হও না!তোমাকে কি জগত টানে না!!
‎এখন কিছু না বলে থাকতে পারলাম না তাই বললাম আচ্ছা তোমার মুখে এসব কথা মানায় না চন্দ্র, তোমার কি একটুও লজ্জা লাগে না এসব বলতে।
‎সে বললো তুমি তো গাইলে নৌকায়,

‎লজ্জা ভয় সব যায় গো ছুটে,
‎যখন সে রুপ ধারণ করি।

আজ নাহয় বেহায়ার মতো নিজের কথা গুলো বলি আবার কবে তোমার দর্শন পাবো সেটা তো জানি না।।।আর আমি তোমাকে তোমার থেকে ভালো চিনি তুমি আর আমার সামনে আসবা না সেটাও জানি।

আমি হা করে চেয়ে থেকে দেখলাম একজন আধুনিকা মেয়ে কিভাবে আধ্যাতিক ধাচের সব কথা আর প্রশ্ন করতেছে,আর আমাকে আমার সাঁইয়ের গানের লাইন শুনিয়ে উত্তর দিয়ে দিলো।।
এই তো ছয় মাস আগে এক জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ও কে দেখেছিলাম বড়ই চঞ্চলা, নির্মলা, হাস্যরসাত্মক ভাবে দৌড়ে বেড়াইতে সেই মেয়ে আজ এতো কঠিন কথা বলতেছে যার উত্তর আমার কাছে নাই।

পরের দিন আমরা ফিরে আসলাম চন্দ্রকথা সারারাস্তা আর আমার সাথে কথা বলে নাই।।ঘাটে নেমে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে সাহস করে এগিয়ে গেলাম চন্দ্রের দিকে তখন প্রায় দুপুর দুটোর মতো বাজে, তাকে বললাম প্রিয় আমি চলে যাচ্ছি অদৃষ্টেরর লিখন থাকলে কোনদিন হয়তো দেখা হবে, ভালো থেকো নিজের খেয়াল রেখো।।ছোট একটা চিরকুট তার হাতে দিয়ে চলে আসলাম সে হা করে চেয়েছিলো আমার দিকে আমি শুধু একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে তার মুখে পানো চেয়েছিলাম তারপর আর ফিরে তাকাইনি।।।
চিরকুটে লিখেছিলাম,
ভর দুপুরে যে যমুনার পাড়ে চাঁদ উঠেছে সেটা কি কেউ দেখেছে!
জীবনে প্রথম দিনের বেলায় চাঁদ দেখে গেলাম হয়তো এই সৌভাগ্য আর হবে না।
চন্দ্রকথা তুমি আসলেই চন্দ্রের ন্যায় সুন্দর তবে তুমি নিষ্পাপ তোমার গায়ে কলঙ্ক নেই।।
‎ তোমার ঠাঁকুর।

আমাকে সে ঠাঁকুর বলে ডাকতো।

দুবছর আগে এরকম এক বৈশাখে তার সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিলো। চলে আসার পর আর আর ফিরে যাই নি কখনো এখন তো আমি নির্বাসনে।

– লিখেছেন: Ah Rudra

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s