‘ হারানো আমি ‘

আজ অনেক দিন পর নরসিংদী পার্কে হাঁটতে বের হয়েছি । হাঁটতে ভালই লাগছে। সেই সাথে এক ধরনের শূন্যতাও গ্রাস করছে। কাউকে হারানোর শূন্যতা।
নরসিংদী পার্কের এই পরিচিত রাস্তাগুলোতে
অনেকবার নীলার হাত ধরে হেঁটেছি । আজ আর নীলা নেই ।
তাই একাই হাঁটতে হচ্ছে ।
নীলাকে আমার জীবন থেকে হারিয়ে ফেলেছি,প্রায় বছর খানেক হয়ে গেল ।
পার্কের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে কালামের ছোট
চায়ের দোকানটা চোখে পড়লো । অনেকদিন এই দোকানটাতে চা খাওয়া হয় না । ১২-১৩ বছরের কালাম নামের এই ছেলেটা অসাধারণ চা বানায় ।
নীলা আর আমি এই দোকানটাতে অনেকবার চা খেয়েছি ।
নীলা যে স্যার এর কাছে Physics প্রাইভেট পড়তো সেই
স্যার এর বাসা ছিল পার্কের কাছেই । বিকালবেলা ওর প্রাইভেট শেষ হলে মাঝে মাঝেই আমাকে ফোন দিয়া পার্কে আসতে বলতো । বিকালবেলা ওর সাথে পার্কে
হাঁটতে এসে প্রায়ই কালামের দোকানে চা খাওয়া হতো।
দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কালাম ডাকলো,
`আদনান ভাই,কই যান?’
এইতো, হাঁটতেছি ।‘
চা খায়া যান । অনেকদিন ধরে তো আসেন না । আফা
আহে নাই ?’
কালামের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দোকানে গিয়ে
বসলাম ।
দোকানে গিয়ে বসতেই কালাম এক কাপ চা বানিয়ে হাতে দিল ।
চা খেতে গিয়ে নীলার কথা প্রবলভাবে মনে হচ্ছিলো ।
ও আমার জীবনে কেন এলো , আর কেনই বা কষ্ট দিয়ে চলে গেলো ?
মনে হচ্ছে , এইতো সেদিনের ঘটনা । পাশের বাসায় আসা নতুন ভাড়াটিয়ার সুন্দরী মেয়েটিকে হঠাৎ আমার নজরে
পড়লো । সে দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার । কলেজ শেষ করে যখন বাসায় ফিরি তখন পাশের বাসার ২য় তলার বারান্দায় চোখ চলে যায় । দেখলাম , উদাস উদাস ভাব
নিয়ে একটি মেয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে ।
প্রথম দেখাতেই মেয়েটিকে কেমন যেন ভালো লেগে গেলো । তারপর মাঝে মাঝেই মেয়েটির সাথে রাস্তায়
দেখা হতো । কখনও দেখতাম বিকালে প্রাইভেটে যাচ্ছে,কখনও দেখেছি স্কুল টাইম এ রিক্সার জন্য দাড়িয়ে আছে ।
একদিন হঠাৎ মাথায় ভূত চাপলো নীলাকে রিক্সার পেছন পেছন ফলো করে ওর স্কুল পর্যন্ত যাবো । যেই ভাবা সেই কাজ।ওর স্কুল টাইম এ বাসা থেকে সাইকেল নিয়ে বের হলাম । কিছুক্ষন পরই নীলা বাসা থেকে বের হয়ে রিক্সায় উঠলো। আমিও সাইকেল নিয়ে ফলো করে ওর স্কুল পর্যন্ত গেলাম । ও স্কুলে ঢুকে গেলে আমি আবার বাসায় চলে আসলাম । এভাবে মাঝে মাঝেই ফলো করতাম ।
একদিন ফলো করছি এমন সময় দেখলাম , নীলা বারবার রিক্সার পেছন দিকে তাকিয়ে আমাকে দেখছে । বুঝতে পারলাম ফলো করার ব্যাপারটা ও ধরে ফেলেছে । তাই , ওই দিনের পর থেকে ভয়ে আর ফলো করি নাই । কিন্তু
আমি যে নীলার প্রতি কিছুটা দুর্বল হয়ে পরেছি সেটা আস্তে আস্তে অনুভব করলাম । মনে মনে চিন্তা করছিলাম , কিছু একটা অবশ্যই করতে হবে । আল্লাহের রহমতে একটা রাস্তা পেয়েও গেলাম ।
আমার এক মেয়ে ফ্রেন্ড নীলাদের বাসার নিচের তলার ফ্ল্যাট এ থাকতো । সুযোগ বুঝে আমার ফ্রেন্ডকে একদিন সব খুলে বললাম । ওর সাহায্যেই আমি পরে নীলার মোবাইল নাম্বারটা পেয়ে গেলাম । শুরু হল মেসেজ
পাঠানো । নীলাকে মাঝে মাঝেই মেসেজ পাঠাতাম ।
একদিন সাহস করে কল করে বসলাম । ও ফোন রিসিভ করার পর ভদ্র ভাষায় কিছু গালি শুনতে হল । তবুও নাছোড়বান্দার মত লেগেই রইলাম । মাঝে মাঝেই কল করতাম ।কিন্তু ও রিসিভ করতো না । তারপর কলেজ এ
পরীক্ষা শুরু হয়ে যাওয়ায় ব্যস্ততায় নীলার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম । ওকে পাবার আশাও প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলাম । পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর হঠাৎ একদিন নীলার নাম্বার থেকে আমার মোবাইল এ একটা কল আসে ।
আমিতো আকাশ থেকে পড়লাম । ভয়ে ভয়ে কলটা রিসিভ করলাম । রিসিভ করার পর নীলা যে কথাগুলো বলেছিল সে কথাগুলো হচ্ছে :
আপনি কে সে সম্পর্কে আমি জানতে পেরেছি । সিমি
আপু (আমার সেই মেয়ে ফ্রেন্ড ,যে নীলাদের বাসার
নিচের ফ্ল্যাট এ থাকে) আমাকে সব বলেছে ।
কাউকে ভালো লাগলে সেটা বলতে হয় । কাপুরুষের মত ফোন দিয়ে কাউকে বিরক্ত করে ভালবাসা আদায় করা যায় না । আর কাউকে ভালবাসতে হলে তাকে বুঝতে হয় ,ভালো লাগতে হয় , যাচাই করতে হয় । তারপর তো
ভালবাসা । হুট করে ভালবাসার কথা বললেই ভালবাসা যায় না । ‘
এই কথাগুলো বলে ও লাইন কেটে দেয় ।
এভাবেই আমাদের রঙিন স্বপ্ন বোনা শুরু হয়ে ছিল । ওই দিনের ফোন কলের পর থেকে আমি সব সময় নীলার পাশে থাকার চেষ্টা করেছি । মাঝে মাঝেই ওর স্কুল এ যাওয়ার সময় সাইকেল দিয়ে রিকসার সাথে সাথে ওর
স্কুল পর্যন্ত গিয়েছি । বিকালেও প্রায়ই ওর প্রাইভেট এ যাওয়ার সময় সাথে সাথে গিয়েছি । ও শুধু পিছনে ফিরে মুচকি হাঁসতো । এই মুচকি হাসিটাই আমার কাছে চাঁদের আলো মনে হতো।
এভাবে চলার দুই মাস পর নীলাকে সরাসরি প্রপোজ করলাম ও কিছু না বলে শুধু একটু হেসেছিল । ২ দিন পর ও যখন
আমার প্রস্তাবে হ্যাঁ’ বলল তখন আমি যে কি খুশি হয়েছিলাম সেটা বলে বোঝানো যাবে না ।
আমাদের দিনগুলো স্বপ্নের মত এগিয়ে যেতে লাগলো ।
নীলার ভালবাসায় নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হতো ।
আমার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝেই নীলা জিজ্ঞেস করতো , আমাকে ছেড়ে কখনো যাবে নাতো ?’আমি ওর হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বলতাম , আমার এই লক্ষ্মী পাগলীটাকে ছেড়ে আমি কখনোই যাবোনা ।‘
এইভাবে স্বপ্নের ঘোরে অনেকগুল দিন কেটে গেলো । নীলা এস .এস .সি তে জি .পি . এ – ৫ পেয়ে ভিকারুন্নিসা কলেজ এ ভর্তি হল । ও ঢাকা চলে যাওয়ার আগের দিন
আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কেদেছিল । ও ঢাকায় ওর খালার বাসায় থাকতো । কলেজ বন্ধ হলে ও যখন
নরসিংদীতে আসতো তখনি শুধু আমাদের দেখা হতো । আর ফোন এবং ফেসবুক এ তো সব সময় যোগাযোগ থাকতোই ।আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়লাম এইচ .এস . সি পরীক্ষা নিয়ে ।
কেটে যেতে লাগলো দিনগুলো ……….
এইচ.এস.সি পরীক্ষা হয়ে গেল । জি .পি . এ – ৫ পেয়ে ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হলাম । তারপর শুরু হয়ে গেল ভর্তি
যুদ্ধ । চান্স পেলাম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে । নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনালি দিন আর নীলার ভালবাসা নিয়ে মুহূর্তগুলো ভালই কাটছিল ।
কিন্তু আমাদের সুখটা আর বেশি দিন স্থায়ী হল না । আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে নীলার ফ্যামিলিতে জানাজানি হয়ে গেল ।
ফ্যামিলির চাপে এক সময় নীলা আমার সাথে যোগাযোগ করা বন্ধ করে দিল ।ভেবেছিলাম সব ঠিক হয়ে যাবে । কিন্তু , কিছুই ঠিক হল
না । জীবনটা কালো অন্ধকারে ঢেকে গেলো হঠাৎ করেই । দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছিলো । মোবাইলে কল আসলে মনে হতো এই বুঝি নীলা ফোন করলো । কিন্তু , সেই আশা আশাতেই থেকে যেতো । শুধু ভাবতাম , ফ্যামিলির
চাপে ও আমাকে এত সহজেই ভুলে গেলো ।
প্রায় দেড় মাস পর যখন সত্যি ঘটনাটা জানতে পারলাম তখন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো ।আসলে , নীলা আরেকটি ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল । তাই , ফ্যামিলির চাপের অজুহাত দেখিয়ে ও আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলো । চম্পা নামে নীলার এক বান্ধবীর কাছ থেকে যেদিন কথা গুলো
শুনেছিলাম সেদিন কিছুতেই নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না । মনে হচ্ছিলো এটা একটা স্বপ্ন ,আর স্বপ্নটা বুঝি এখনি ভেঙে যাবে । যেই মানুষটাকে এত বেশি বিশ্বাস করতাম , এত বেশি ভালবাসতাম সেই
মানুষটা আমাকে আজ এভাবে কষ্ট দিলো ।
ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে সেদিনই নীলাকে ফোন দিয়েছিলাম ।
ভেবেছিলাম সবই মিথ্যা বলে প্রমাণিত হবে । কিন্তু , সব কিছু ভুল প্রমাণিত করে নীলা যখন সত্যি ঘটনাটি স্বীকার করলো তখন আমি কিছুক্ষনের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম । ইচ্ছা হচ্ছিলো দৌড়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যাই ।
‘ কি দোষ ছিল আমার ? কি ভুল করেছিলাম আমি ?
আমিতো শুধু ভালবেসেছিলাম । ‘
‘ হে আল্লাহ , আমার ভালোবাসাটাই কি দোষ ছিল ।
এটাই কি আমার ভুল ছিল । ‘
আসলে , এরকম দুঃখ পাওয়াটাই মনে হয় ভালোবাসা ।
কথাগুলো চিন্তা করতে করতে কখন যে অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে বুঝতেই পারলাম না । ঘোর ভাঙল কালামের ডাকে ।
-আদনান ভাই , আপনের চা তো অনেক আগেই ঠাণ্ডা হইয়া
গেছে । আরেক কাপ চা বানায়া দেই ?
-না থাক । আজকে আর লাগবে না । আরেকদিন এসে খাবো ।
চায়ের কাপটা রেখে টাকা দিয়ে যখন চলে আসছিলাম ,
তখন আবার পিছন থেকে কালাম ডাক দিলো ।
-আদনান ভাই , একটু শুইনা যান ।
যাওয়ার পর কালাম আমাকে ওর দোকানের পিছনে একটা
গোলাপ গাছ দেখাল । গাছটাতে একটা গোলাপ ফুটে
আছে । তখনি আমার গাছটার কথা মনে পড়লো । আমিতো
একবারে ভুলেই গিয়েছিলাম । গত বছর , বৃক্ষ মেলা থেকে
এই গোলাপ গাছটা কিনে নীলা এখানে এনে রোপণ
করেছিলো ।বলেছিল , আমাদের ভালোবাসার
নিদর্শনস্বরূপ গাছটা এখানে থাকবে । গাছটা ঠিকই রয়ে গেছে , কিন্তু আমাদের ভালোবাসাটা হারিয়ে গেছে ।
-আদনান ভাই , আরেকদিন আসার সময় আফারে সাথে
কইরা নিয়া আইসেন । আফা গাছে ফুল দেখলে অনেক খুশি হইব ।
সে কি আর কখনো আসবে এই দোকানে চা খেতে ? হয়তো আসবে অন্য কারো হাত ধরে কথাগুলো চিন্তা করতে করতে হেঁটে যাচ্ছি। পার্কের সেই চিরচেনা পথটি ধরে…
– লিখেছেন: Spark Adnan

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s