‘ জীবন তরী ‘

বাড়িওয়ালা হরিয়াল খা দড়জার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। পাখিদের নামে সাধারণত সব সময় মেয়েদের নাম রাখা হয়। তবে হরিয়াল পাখিদের নামে কেমন জানি একটা পুরুষ পুরুষ ভাব আছে। যদিও হরিয়াল খার মধ্যে তার ছিটেফোঁটা ও দেখা যায় না। তিনি পাখিদের নামের সাথে স্বভাবের ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন।

হরিয়াল খা চাচা সারাদিন তেমন কিছুই করেন না। দিনের বেশিরভাগ সময়েই দাড়োয়ানের সাথে বসে গল্প করেন। তখন উনার লুঙী উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হয়া যায়।
কোনো চাকরি নেই, বাসা ভাড়া যা আসে তা দিয়েই একা জীবন ভালমতো কাটিয়ে দিচ্ছেন।
লোকটাকে হাসানের সুবিধার মনে হয় না। গভীর রাতে এসে নিচু গলায় দড়াজার ওপাশ থেকে ডাকাডাকি করেন। হাসান কোনো উত্তর দেয় না। আওয়াজ দিলেই সমস্যা, হাসান শুনেছে এর আগে যারা এখানে ভাড়াটিয়া হয়ে থেকেছে,তাদের মধ্যে যাদের ঘরে গভীর রাতে হরিয়াল খা ঢুকেছেন তারা পরের দিন সকালে স্যুটকেস ভর্তি জামা কাপর নিয়ে বাসা ছেড়ে চলে গেছে। রহস্যময় ব্যাপার স্যাপার।
লোকটার সামনে দিয়ে এখন বেড় হয়ে যেতে হবে ভাবতেই হাসান শিউরে উটছে।
কি আর করার! হাসান সামনে গিয়ে সালাম দিল,আসসালামু আলাইকুম চাচা।
হরিয়াল খা সালামের উত্তর না দিয়ে মুচকি হাসলেন। পান খাওয়া দাত বেড় করে ভুঁড়ি দুলিয়ে হাসতে লাগলেন। সেন্টু গেঞ্জির এক হাতা নেমে এসে একটা স্ত* বেড়িয়ে এসেছে। কি বিচ্ছিরি অবস্তা। হাসানের বমি আসছে।

” চাচা আমাকে একটু যেতে হবে।
” তা তো যাবেই। রাতে কি করো? রাতে লুডো খেলতে কতবার যে আসি, তোমার কোনো সাড়াশব্দ পাইনা
” হাসান একটা ঢোক গিলে বললো’ চাচা আপনি এই বয়সে এসব কি বলেন!
” কি করবো বলো বাবা! একা মানুষ। বউ বাচ্চা নেই,রাতের বেলা বড় একা একা লাগে।
” চাচা
” হুঁ বলো ”
” শুনলাম দাড়োয়ান নাকি চলে যেতে চাচ্ছে। আজকে তার গ্রামের বাড়ি থেকে চিঠি এসেছিল। আমি তাকে পড়ে শুনালাম। তার স্ত্রী সন্তান সম্ভবা। সে চলে যাবে ছয় মাসের জন্য। তার বউয়ের সেবা যত্ন করতে চায়।

হরিয়াল খা হাসানের এই কথা গুলো শুনে একরকম হাহাকার করে উটলেন ‘ বলো কি! বলো কি হাসান! তুমি বলো কি! এই বলে ভুঁড়ি নাড়িয়ে দৌড়ে নামতে শুরু করলেন সিঁড়ি দিয়ে।

রাস্তের পাশে মিউজিকের দোকানে গান হচ্ছে, প্রথমে একটা হিন্দি গান বাজানো হলো। ও.. সাইয়া দিল মে আনা রে.. আকে ফির না যানা রে..’ তার পর দুম সিনেমার গান,দুমআ চালে.. দুমআ চালে.. এখন বাজছে রবীন্দ্রনাথের গান। গান ওয়ালা মনে শান্তি পাচ্ছে না। রবীন্দ্রনাথের গানে তার মনে শান্তি এসেছে।
কাঞ্চন আলি টি এন্ড কফি শপের একটি ব্রেঞ্চেতে বসে আছে হাসান। দোকানদারের নাম কাঞ্চন আলি না। আব্দুল গাফফার।
এখানে রঙ চা ছাড়া দুধ চা ও পাওয়া যায় না। কফি অনেক দূরের ব্যাপার।
তবুও এমন অদ্ভুত অযৌক্তিক নাম কে ঠিক করে দিলো হাসান ভেবে পায় না।

রঙ চায়ে প্রথম চুমুক দিতেই মীরাকে দেখা গেল,হেটে হেটে আসছে। হাসানের হাত থেকে কাপ পরে গিয়ে প্যান্ট ভিজে বিচ্ছিরি অবস্তা। তার উপর আবার প্যান্টের ভেতর উষ্ণতা টের পাওয়া যাচ্ছে। হাসান প্যান্টের উপর দিয়ে ফু দিতে দিতে বলল, মাই গড! ওহ গড! হেল্প মি।
চাচা মিয়া গট গট কি করেন!
হাসান চমকে উটে দেখলো আব্দুল গাফফার মিয়া কথা বলছে, মূখে মলীন হাসি। যেন হাসানের গট গট করায় সে আনন্দিত।
হাসান ভেবো পেলো না তাকে চাচা মিয়া ডাকার মানে কি! সে কি বুড়ো হয়ে গেছে? যত্তসব ছোটলোকের চিন্তা ধারা।
মীরা এগিয়ে আসছে, হাসানের হার্ট দ্রুত রক্ত পাম্প করতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে ব্লাড প্রেশার বেড়ে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যে। তার উপর আবার প্যান্ট ভিজে গরম চায়ের ধোয়া বের হচ্ছে।
সব মিলিয়ে হাসানের ইচ্ছা করছে কোনো এক চলন্ত ট্রাকের নিচে পড়ে যেতে। যেন এই বেইজ্জতি থেকে সে রক্ষা পায়। কিন্তু সে সাহসটুকু ও তার নেই। এমন অপদার্থ হয়ে জন্ম নেয়ায় সে তার ভাগ্যকে শুয়োরছানা বলে তিনবার গালি দিল।

মীরা প্রায় চলে এসেছে হাসানের একদম কাছে।
” আরে হাসান ভাই ‘ আপনার প্যান্ট থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে কেন!
হাসান তথমত খেয়ে গেল। কি বলবে ভেবে না পেয়ে বাইং মাছের মত কিছুক্ষণ খাবি খেয়ে চুপ করে রইল।
” কি হলো হাসান ভাই! চুপ করে গেলেন কেন! প্যান্ট তো ভেজা দেখা যাচ্ছে” গরম পানি পড়েছে? কিভাবে পড়লো?
এই বলে মীরা হাসতে লাগলো, কিন্নর কন্ঠের হাসি। হাসান মুগ্ধ হয়ে মীরার দিকে তাকিয়ে আছে, কারোর হাসি এতো সুন্দর হতে পারে সেটা মীরাকে না দেখলে কোনোদিনই জানা হতো না।
ভেতরে মুগ্ধতা নিয়ে হাসান দাঁড়িয়ে আছে,দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি দেখে মনে হতে পারে সে বিরক্ত হচ্ছে।

” স্যরি ‘ আপনি বোধহয় বিরক্ত হচ্ছেন। কফি খাবেন?
” না।
” না কেন? চলুন খেয়ে আসি।
” ভাল লাগছে না । তুমি বরং বাসায় যাও মীরা।
” না। আপনি আগে আমার সাথে আসুন,কফি খাওয়া হবে। তারপর অন্য কথা।হাসান যেতে চায় নি তার পরও অনিচ্ছা স্বর্ত্বে যেতে হলো। যেতে না চাওয়ার মূল কারণ ধোঁয়া উটা ভেজা প্যান্ট।
বিপদ যখন আসে তখন এক সাথে দুটা আসে, দুটা বিপদই কেটে গেছে। এক হরিয়াল খা, দুই গরম চায়ে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলা।
এখন আর কিছু হবে না বলে আশা করা যায়।

কফি শপে ঢুকে সামনাসামনি দুটা চেয়ারে বসে আছে হাসান এবং মীরা। হাসানের দৃষ্টি প্যান্টের ভেজা অংশের দিকে, ওখান থেকে এখনো ধোঁয়া বেড় হচ্ছে।
বিচ্ছিরি অবস্তা।
কফি চলে এসেছে। হাসান কফির মগ হাতে নিয়ে পায়ের উরুতে রাখলো যেন বুঝা না যায় ধোঁয়া এক্সেক্ট কোথা থেকে বেড় হচ্ছে।
” হাসান ভাই!
” হ্যা মীরা বলো।
” আপনি আজ ঝিম ধরে বসে আছেন কেন! কথা বলুন।
হাসান কি বলবো ভেবে না পেয়ে আবারো কিছুক্ষণ বাইং মাছের মত খাবি খেলো।
মীরা বললো ” আপনি তো আমাদের বাসায় আসা ছেড়েই দিয়েছেন। অবশ্য আমার মনে হয় আপনার না আসাই ভাল ।
ভাইয়াকে পুলিশ ধরে জেলে ঢুকিয়ে দেয়ার পর বাবা একটা দু- নলের বন্ধুক নিয়ে বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে থাকেন, বিড় বিড় করে বলেন হারামজাদারে খাইসি! আপনি এলেই গুলি করা হবে।
কোনো কোনো দিন বন্ধুক হাতে নিয়ে বাবা ঘুমিয়ে পড়েন তখন বাবার মধ্যে একটা দাড়োয়ান দাড়োয়ান ভাব চলে আসে।
হাসান আবার কিছুক্ষণ খাবি খেলো।
” হাসান ভাই! আপনার এই খাবি খাওয়া রোগ কোথা থেকে যোগাড় করলেন? কিছু বললেই খাবি খেতে থাকেন।আজব!
হাসান তথমত খেয়ে বললো, কিন্তু আমি তো ঐ সব ব্যাপারে কিছুই জানতাম না মীরা। পরে যখন জানতে পারি তখন সে জেলে।
মীরা বলল ‘ হাসান ভাই আমি জানি । থাক ঐ সব ব্যাপার।
” কফি ভাল হয়েছে? ”
” হ্যে ”
” এখনো কি ধোঁয়া উড়ছে?
” না।
” না কেন?
” কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে।
” কফি না, আপনার প্যান্ট থেকে কি ধোঁয়া উড়ছে?
হাসান আবার বাইং মাছের মত খাবি খেতো লাগলো।
” তাহলে যাই হাসান ভাই? আর কফির বিলটা দিয়ে দিবেন।
” আচ্ছা ”
” আর বলছেন যখন কফি ভাল হয়েছে তখন অবশ্যই কফি মেকার কে কিছু টিপস দিয়ে আসবেন,এই ভদ্রতাটুকু করা উচিৎ।
” আচ্ছা।

মীরা চলে যাওয়ার পর বাতাসে মীরার শরীরের গন্ধ রয়ে গেল। একটি কথা বলতে চেয়েও বলা হলো না। কথাটা বলতে না পারায় হাসানের কষ্ট হচ্ছে। আজকে সব প্রস্তুতি নিয়েও কেমন করে একের পর এক গণ্ডগোল লেগে গেল।
নিয়তি চাচ্ছে না হাসান মীরাকে কথা গুলো বলুক।
মীরার চলে যাওয়ার পথে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে পকেটে হাত ঢুকাতেই হাসান আবার বাইং মাছের মত খাবি খেতে লাগলো। হরিয়াল খার হাত থেকে বাচতে তাড়াহুড়ায় মানিব্যাগ ফেলে এসেছে।
বিপদ যখন আসে তখন এক সাথে দুটা আসে। ব্যাপারটা তাহলে মিথ্যা।

রাতের খাবার খেয়ে হাসান বিছানায় উবুত হয়ে পড়ে আছে। রাস্তার পাশের মিউজিকের দোকানে কোন গানটা বাজছিল মনে করার চেষ্টা করছে। এমন সময় হরিয়াল খা দড়জায় টক টক করলেন, হাসান কোনো কিছু না ভেবে সোঝা গিয়ে দড়জা খুললো।
দেখা গেল হরিয়াল খা লুডো হাতে হাসি মূখে দাঁড়িয়ে আছেন।
” কি বাবা! ঘুমিয়ে পড়েছিলে?
” না চাচা ‘ ঘুমাতে যাচ্ছি।
” ঘুমাবেই তো, চলো কিছুক্ষণ লুডো খেলি।
” ওহ আচ্ছা ” আপনি এই লুডোর কথা বলেছিলেন?
” হ্যা ‘ তুমি কি ভেবেছিলে?
হাসান কিছুক্ষণ ঘাড় চুলকে উত্তর দিল, না আমি আসলে ভেবেছিলাম অনেক বড় লুডো হবে।

রাত বারোটার সময় মীরাদের বাসায় হুলুস্থুল ব্যাপার।মীরার বাবা হার্টের পেশেন্ট তবুও তিনি উত্তেজনায় ছটফট করছেন। দুই- নলা বব্ধুক নিয়ে পুরোঘরে উত্তেজিত ভঙ্গিতে হাটাহাটি করছেন।
বব্ধুক নিয়ে হাটার মত কোনো ঘটনা ঘটে নি তবুও কেন বন্ধুক নিয়ে হাটাহাটি করছেন তিনি নিজেও জানেন না। আজাদ সাহেবের
স্ত্রী এবং তার ভাই সাথে করে কামরুজ্জাম কে নিয়ে এসেছেন। কামরুজ্জাম বিলেতি লোক। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ।
মীরার সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। এই মাসের পনেরো তারিখে হবার কথা কিন্তু কামরুজ্জাম সাহেবের দাদী স্ট্রোক করে সিংগাপুর মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটালে পড়ে আছেন। শেষ ইচ্ছা হিসেবে নাতীর বউ দেখে মরতে চান।
তাই তারা এসেছেন আজ রাতেই বিয়ে পড়িয়ে দিতে, সকাল ৪ টায় ফ্লাইট।
তারা সঙ্গে একজন কাজী সাহেবকেও নিয়ে এসেছেন।
মীরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। শাড়ি পড়তে হবে , তারা শাড়ি নিয়ে এসেছে কিন্তু সেটা মীরার ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। বিলেতি লোক গুলা যে কেন এত কৃপণ হয় মীরা ভেবে পায় না।
টাকা বাচানোর জন্য বাহানা বানিয়ে বিয়ে ও পড়িয়ে নিচ্ছে । মৃত্যুুর মূখে দাঁড়িয়ে কেউ নিশ্চিয়ই নাত বউয়ের মূখ দেখতে চাইবে না।
বিয়েটা কিছুদিন পরে হলেই বা মন্দ কি ছিল!
মীরা লাল শাড়ির পড়েছে,কপালে কালো টিপ, হাতে সবুজ চুড়ি। সব কিছুই কেমন জানি বেমানান লাগছে। মীরা সব আবার খুলে ফেলল।
হঠ্যাৎ করে কেন জানি মীরার মনটা খারাপ হয়ে গেল। আর মাত্র কয়েক ঘন্টা পর তাকে এই দেশ, এই দেশের সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হবে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে।
কেন!
কার জন্য যাবে সে!

হরিয়াল খা এবং হাসান লুডো খেলছেন। রাত চারটার উপরে। হাসান ঘুমে চোখ মেলে রাখতে পারছে না, হরিয়াল খা হড়হড় করে কথা বলছেন। এবার হাসান মূল ব্যাপারটা ধরতে পারলো । কেন ভাড়াটিয়ারা পরের দিনই বাসা ছেড়ে চলে যায়। হঠ্যাৎ হাসানের মনে হলো মানুষের জীবনের সাথে লুডো খেলার কি অদ্ভুত মিল তাইনা! দুটোতেই গুটি ফেলবো আমরা,আর পাওয়া না পাওয়ার হিসেব মিলাবে অন্যকেউ। সে অন্য কেউটা কে! নিয়তি?
দুটোতেই নিয়তি আমাদের সাথে খেলে।

হাসানের মাথায় একটা ব্যাপারই ঘুরছে বার বার। রাস্তার পাশের ঐ মিউজিকের দোকানে রবীন্দ্রনাথের কোন গানটা বাজছিল!
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই
নাকি অন্য কোনো গান?
মেঘ বলেছে যাব যাব?
গানের দুটো লাইন যেন কি ছিল।

প্রেম বলে যে যুগে যুগে তোমার লাগি আছি জেগে।
মরণ বলে আমি তোমার জীবন তরী বাই ”

– লিখেছেন: Naimur Rahman Shaon

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s